সুমেরীয় সভ্যতার কথকতা
সুমেরীয় সভ্যতা
আনুমানিক
খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০০ অব্দে আধুনিক ইরাকের টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর
অববাহিকায় পর্যায়ক্রমে কয়েকটি সভ্যতার উন্মেষ ঘটে। একই ভূখন্ডে গড়ে ওঠায় এ সভ্যতাগুলো একত্রে
‘মেসোপটেমীয়
সভ্যতা’ নামে পরিচিত। মেসোপটেমীয় ভূখন্ডে যে সভ্যতাগুলো গড়ে
উঠেছিল সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে সুমেরীয় সভ্যতা, অ্যাসেরীয় সভ্যতা ও ক্যালডীয় সভ্যতা।
নির্ভরযোগ্য প্রমাণের অভাবে সুমেরীয়দের আদি বাসস্থান সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যায় না। কিছু ঐতিহাসিকের মতে, সুমেরীয়দের একটি দল ৪০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের
দিকে মেসোপটেমিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চল বিশেষত এলেমের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে এসে দক্ষিণ মেসোপটেমিয়ার নিন্মাঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছিল। তাদের নামানুসারে এ সভ্যতাটি সুমেরীয়
নামে পরিচিত হয়। খ্রিষ্টপূর্ব ৩৫০০ অব্দে কৃষি ও কারিগরি শিক্ষায়
দক্ষ সুমের জাতি এ অঞ্চলে প্রাচীন
এ সভ্যতার উন্মেষ ঘটিয়েছিল।
সুমেরীয়রা
কতগুরল নগরের গোড়াপত্তন করেছিল । তাদের সভ্যতার
প্রাণ কেন্দ্র ছিল- লাগাস, কিস, ইরিদু এবং উরুক। সুমেরীয়রা প্রথম মেসোপটেমিয়া অঞ্চলে খাল খনন, জলাশয় ও বাধ নির্মান
করে সেচ ব্যবস্থা গড়ে তোলে এবং নিজেদের উন্নতি ঘটিয়ে নগর সভ্যতার উদ্ভব ঘটায়। ৩৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের মধ্যে প্রায় ১৮টি নগর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এসব নগর রাষ্ট্রের প্রশাসকদের ‘এনসি ‘ নামে ডাকা হতো। বিখ্যাত শাসক সারগন সুমেরের নগর রাষ্ট্রগুলিকে একত্রিত করে সভ্যতার বিকাশ ঘটান। সুমেরিয়ায় সারগনের প্রতিষ্ঠিত আক্কাদীয় রাজ্য দুশো বছরের স্থায়ী ছিল। সুমেরীয়দের পরবর্তী বিখ্যাত শাসক ছিলেন ‘ডুঙ্গি’। সম্রাট ডুঙ্গির
নেতৃত্বে সুমেরীয়গণ খ্রিষ্টপূর্ব ২১০০ অব্দে একটি ঐক্যবদ্ধ সাম্রাজ্য গড়ে তুলেন। ডুঙ্গি সুমের জাতির জন্য সর্বপ্রথম একটি বিধিবদ্ধ আইন বা কোড প্রচলন
করেন।
সুমেরীয় সমাজ বিভিন্ন স্তরে বিভক্ত ছিল। প্রথমস্তরে ছিল শাসক, ধর্মযাজক, দ্বিতীয় স্তরে সাধারণ নাগরিক এবং তৃতীয় স্তরে ক্রীত দাস সম্প্রদায়। শাসকগণ ইশ্বরের প্রতিনিধি দাবি করে দেশ শাসন করতেন। দাসদাসীরা শাসকদের সেবায় নিয়োজিত থাকতো। স্বাভাবিক ভাবেই দাসদাসী এবং কৃষক ছিল সুবিধাবঞ্চিত সম্প্রদায়।
সুমেরীয়দের
আইনের মূল বিষয় ছিল প্রথমতঃ অপরাধীকে তার কৃত অপরাধের জন্য তদ্রুপ শাস্তি দেয়া, অর্থাৎ চোখের বদলে চোখ। দ্বিতীয়তঃ একধরণের বিচার আদালত বিদ্যমান ছিল, যেখানে বাদী-বিবাদী উভয়কেই হাজির করা হতো। তৃতীয়তঃ ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক মর্যাদার
প্রতি লক্ষ্য রাখা হতো। বিশেষ করে সামরিক বাহিনীর বিচারকার্য কঠোর ছিল। অথচ সামরিক বাহিনীতে একমাত্র অভিজাতদেরই অংশগ্রহণ করার সুযোগ ছিল। অন্যান্য সমাজের মতো সুমেরীয় আইনও গড়ে ওঠেছিল তাদের সামাজিক বিধি ব্যবস্থার মধ্যদিয়েই। সুমেরীয়দের বিখ্যাত সম্রাট ডুঙ্গি প্রথম আইন সংকলণ করেন। সুমেরীয়দের আইন ব্যবস্থা পরবর্তী সমসাময়িক সভ্যতাগুলির উপর প্রভার বিস্তার করেছিল।
সুমেরীয়রা
অনেক দেব দেবীতে বিশ্বাসী ছিলেন। তাদের এক একটি দেবতা
এক একটি নামে পরিচিত ছিল। বিখ্যাত দেবতা শামাশ সূর্যদেবতা, এনলিল বৃষ্টি ও বায়ুর দেবতা
এবং ইশতা নারী জাতির দেবতা নামে পরিচিত ছিলেন। তবে তাদের প্রধান দেবতা ছিল নার্গাল। সুমেরীয় সভ্যতায় মিশরীয় সভ্যতার অনেক প্রভাব থাকলেও মিশরীয়দের মতো তাদের মধ্যে পরকালের ধারণা বা পুর্নরুজ্জীবন বা
স্বর্গ-নরকের ধারণার জন্ম লাভ করেনি। সম্ভবতঃ এই কারণে সুমের
অঞ্চলে মৃতদেহকে কেন্দ্র করে কোন প্রকার অট্টালিকা, সমাধি বা মমির প্রবণতা
দেখা যায় না। তারা মৃতদেহকে কবর দিত।
সুমেরীয়রা
পড়ালেকায় উৎকর্ষ সাধন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কোন কোন ক্ষেত্রে প্রতিবেশী মিশরীয়দেরকে অতিক্রমও করেছিল। যেমন, সুমেরীয়রা ‘গিল গামেশ’ নামক মহাকাব্য রচনা করেছিল। খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ অব্দে এই মহাকাব্য রাচিত
হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।
সুমেরীয় সভ্যতার অন্যতম কীর্তি ছিল একধরনের লিখন পদ্ধতির উদ্ভাবন। এই পদ্ধতি ছিল প্রথমতঃ
চিত্রলিপ এবং পরবর্তীতে তা শব্দলিপিতে রূপান্তরিত হয়। এই লিখন পদ্ধতি ‘কিউনিফর্ম’ নামে পরিচিত। কাঁদা মাটিতে চাপ দিয়ে চিত্রাংকন দ্বারা মনেরভাব প্রকাশ করতো।
সুমেরীয়
নগর সভ্যতায় পোড়া ইটের ব্যবহার হতো। তবে মিশরীয়দের মতো সুমেরীয়রা পাথরের ব্যবহার করতোনা বলে তাদের তৈরি ইমারতে দীর্ঘস্থায়ী হতো না। সম্ভবতঃ সুমের অঞ্চলে পাথর দুস্প্রাপ্য ছিল। তবে তাদের নগর পরিকল্পনা ছিল খুবই নিখুত। দালানের দেয়ার ইটের তৈরী হলেও ছাঁদ ছিল কাঠের তৈরী। সুমেরীয় শ্রেষ্ঠ স্থাপত্যকীর্তি ‘জিগুরাত’ নামক ধর্মমন্দির। প্রায় প্রতি নগরেই এইরূপ জিগুরাত ইমারত তৈরী হয়েছিল।
সুমেরীয়
অন্যান্য কৃতিত্বের মধ্যে ছিল গণনা পদ্ধতি, গুণভাগ নির্ণয়, চন্দ্র ভিত্তিক বর্ষপঞ্জি তৈরী, পানি দ্বারা চালিত একধরনের ঘড়ি। অন্যদিকে কৃষি ছিল সুমেরীয়দের প্রধান জীবিকা। দ্বিতীয় পেশা হিসেবে তারা ব্যবসা বাণিজ্যের প্রচলন ঘটায়। পার্শ্ববর্তী দেশগুলো সঙ্গে তাদের বাণিজ্য সম্পর্ক গড়ে ওঠে।






0টি মন্তব্য:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
এতে সদস্যতা মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন [Atom]
<< হোম