সংসার সুখের হয় রমনীর গুনে...
#ঘটনা -১
অদিতি গেস্টদের জন্য নাস্তার আয়োজন করছিলো। শুভ্রর বন্ধুরা এসেছে। ডাইনিং রুম থেকে লিভিং রুমের সব কথাই শোনা যায়! ফল কাটতে কাটতে হাত টা থেমে গেলো! শুভ্র বলছে- " সংসার সুখের হয় রমনীর গুনে...আর আমার ঘর হলো একরকম রমনী বিহীন।" ব্যাংকার বউ হলে যা হয় আর কি! যদিও হেসে হেসে বলছিলো কথাগুলো! কিন্তু কোথাও একটা প্রচন্ড ব্যাথা হচ্ছিল অদিতির! আজকেই প্রথম নয়। অনেকের কাছেই শুভ্র এমন আক্ষেপ করে! তার নাকি অফিস থেকে ফিরে মাঝে মাঝেই মনে পড়ে- তার বাবা বাড়ি ফিরলে তার মায়ের ব্যস্ততা বেড়ে যেতো!
অথচ এসব বলার সময় একবার ভাবেনা- ফ্ল্যাটের লোন, গাড়ির ই.এম.আই এগুলো কার বেতন থেকে যাচ্ছে! সবচেয়ে কষ্টের ব্যাপার হলো, আজকাল অন্তু আর অরিনও অভিযোগ করে, মা কে কাছে পায়না বলে! ওরা তো জানেনা, অফিসে প্রতিটি মুহূর্ত ওদের কথা কি ভিষণ মনে পড়ে! মায়ের সময় না দেয়াটাই ওরা দেখতে পায়, অথচ ওদের ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল, বিলাসী জীবন, এসবের পেছনে তাদের মা'য়েরও যে একটা ভূমিকা আছে, ভেবে দেখেনা একবার!
#ঘটনা-২
পুজোর ছুটি শুরু হয়েছে। বাচ্চাদের স্কুল বন্ধ। নীরার ছোট বোন বেড়াতে এসেছে বাচ্চাদের নিয়ে। দুই ভায়রা ভাই গল্প করছে, এদিকে ওরা দু'বোন চা বানাতে বানাতে গল্প করছে। বাচ্চারা খেলেছে। রান্নাঘর থেকে স্পষ্ট শুনতে পেলো নীরা, তার স্বামী অনেক আক্ষেপ নিয়ে বলছে-" বুঝলে ভায়া, ঢাকা শহরে একা হাতে ইনকাম করে সংসার চালানো, অনেকটা যুদ্ধের মত। সহোযোগিতা করবার মতো কেউ তো নেই!" নীরা দীর্ঘশ্বাস ফেললো! কথাটা হয়তো সত্যি, কিন্তু পুরোপুরি কি সত্যি? সে কি কোন সহযোগিতাই করতে পারছেনা!
এম.বি.এ শেষ করে বিয়ের আগে থেকেই একটা মাল্টিন্যাশনাল কম্পানি তে চাকরি করতো নীরা! বিয়ের পরও করেছে! কিন্তু শায়ান আসার পর আর পারেনি! বিয়ের পর চাকরি, সংসার একসাথে ঠিকঠাক চালাতে হিমশিম খাওয়া জীবন টা বাচ্চা হবার পরে অসম্ভব হয়ে উঠলো! খুব কঠিন ডিসিশন ছিলো সেটা, তবে তারচেয়েও কঠিন ছিলো সেসময় সবকিছু সামলে চলা! তার স্বামী হাসান চাকরি ছাড়ার ব্যাপারে সম্মতি কিংবা অসম্মতি কিছুই দেয়নি! তবে সেভাবে কোন সহোযোগিতাও করেনি!
এরপর শ্রেয়া, শারাফ হলো। কিভাবে এতোগুলা বছর কেটে গেলো, বুঝতেই পারলোনা নীরা! হাসান ভালো চাকরি করে৷ তবুও তিন বাচ্চা সামলে ঢাকায় চলা সত্যিই কঠিন। নীরা সেটা জানে! আর জানে বলেই সংসারের অনেক খরচই সে কমাবার চেষ্টা করে! বাচ্চাদের পড়াশোনা, সংসারের যাবতীয় কাজ সে একা সামলে নেয়! এদিক সেদিক থেকে খরচ বাঁচিয়ে কিছু সেভিংস ও করেছে। বাচ্চাদের জন্য বাড়তি খরচ, এমনকি হাসানের গ্রামের বাড়িতে কোন সমস্যায় সাহায্য প্রয়োজন হলে, সে দিব্বি তার সেভিংস থেকে দিতে পারে। অনেক অবাকও হয় হাসান! কিন্তু কখনো শিকার করেনা! তারচেয়েও বড় কথা, অনেকসময়ই অনেকের কাছে এমন আক্ষেপের কথা বলে, যেমন আজ বলছে! নীরার এই সহোযোগিতাগুলো যতই সামান্য হোক, সত্যিই কি সে হাসানের জন্য সেভাবে কিছু করতে পারেনা?
উপরের দুটো ঘটনাই কিন্তু আমাদের বর্তমান সমাজে নিরেট সত্যি। হয়তো গল্পে কিছুটা ভিন্নতা থাকে, কিন্তু ফলাফল একিই। কিছু ব্যাতিক্রম হয়তো আছে, তবে সে সংখ্যাটা এতোই নগন্য যে, উদাহরণ হিসেবে ধরা যায়না! আমাদের আগের জেনারেশনের মায়েরা শিক্ষা কিংবা সামাজিক কারণে মোটামুটি একটা বড় অংশ একিরকম জীবন কাটাতো। সেজন্য তখন এতোটা তুলনা হয়তো আসতোনা! তবে, কিছু সংখ্যক ছিলো ভিন্ন, তারা সেই শিকলগুলো মুক্ত করে নিজের মনের কথা শুনতো! কিন্তু এ যুগের মায়েদের একটা বড় অংশ, বিশাল এক দ্বন্দ নিয়ে জীবন কাটাচ্ছে। ভালো-মন্দের দ্বন্দ! উচিৎ-অনুচিতের দ্বন্দ!
যে সবকিছু পেছনে ফেলে বাইরের জগতে পা বাড়াচ্ছে, সেও সমালোচিত! আবার যে একটা বিশাল সম্ভাবনা কে বাক্সবন্দী করে, চারদেয়ালে নিজেকে আবদ্ধ করছে, সেও সমালোচিত! আর এই সমালোচনাগুলোর সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হচ্ছে, তাদের সন্তানদের কাছে তারা সঠিক সম্মান টা পাচ্ছেনা অথবা আস্তে আস্তে হারচ্ছে।
আমার কাছে মনে হয়, কর্মহীন নারী বলে কোন শব্দ নেই। প্রত্যেকেই তার জীবনে একজন যোদ্ধা। আর একজন নারী যখন মা, তখন তার যুদ্ধটা দ্বিগুন/ তিনগুন! কে আপনাকে কদর করলো আর কে করলো না, এই বিচারকে প্রাধান্য দিলে, নিজের ভেতরে অশান্তি অনুভব ছাড়া আর কোন সুবিধা আপনি পাবেন না। আপনি ঘরে অথবা বাইরে যুদ্ধ করার যে জীবনটাই বেছে নেন, এর মূল্য আপনাকেই দিতে হবে! যেটা আপনার সাথে যায়, যা কিছু আপনার মন কে সস্তি দেয়, সে জীবনটাই বেছে নিন। তবে খেয়াল রাখার বিষয় হলো- আপনার বেছে নেয়া জীবনের দায়ভার অন্যকারো নয়! দোষারোপ করা থেকে বিরত থাকুন। নিজেকে নিজে মূল্যায়ন করুন! আপনি কতটা কি পারবেন! তারপর নিজেকেই নিজে বলেন- "You are doing great". 🙂
@নুসরাত _শামা
২৭-০৯-২১ইং..

0টি মন্তব্য:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
এতে সদস্যতা মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন [Atom]
<< হোম