সোমবার, ৪ অক্টোবর, ২০২১

শিশুর_জন্য_আলাদা_বিছানা_কেন_দরকার

 #শিশুর_জন্য_আলাদা_বিছানা_কেন_দরকার? 



বেশ কিছুদিন আগে গ্রুপে আমরা একটা প্রশ্ন করেছিলাম মা-বাবাদেরকে যে আপনাদের সন্তানেরা আপনাদের সাথে একই বিছানায় ঘুমায় কিনা এবং তাদের বয়স কতো। ১৫০ জনেরও বেশি মায়েরা অংশগ্রহণ করেছিলেন। নিউবর্ণ থেকে শুরু করে ২, ৩, ৪, ৫….৮, ৯ বছর বয়সী শিশুদের কথাও জানা গেছে যারা মা-বাবার সাথে একই বিছানায় ঘুমায়। আবার কিছু শিশুকে পাওয়া গেছে যারা পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে ঘুমায়। ১৫০ জন মায়ের কাছ থেকে নেয়া তথ্য হলেও মোটামুটি বলে দেয়া যায় এটাই আমাদের বেশিরভাগ পরিবারের চিত্র। আসলে শুরুতে একটি বিষয় বলে নেই, আমরা কাউকে কোন দোষ, বা শেইমিং এর জন্য এই নিয়ে লিখছি না, আসলে এই বিষয়ে আমাদের নতুন করে ভাবার কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে বলেই এই নিয়ে লেখার চেষ্টা করা। আর বিষয়টি সেনসিটিভ হওয়ায় আমি নিজেও লিখবো লিখবো করে দেরি হয়ে গেলো। তবে আমরা সবাই এখানে এডাল্ট এবং সন্তানের মা-বাবা তাই  আমি আমার জায়গা থেকে খোলামেলা আলোচনা করছি, আশা করছি আপনারাও সহজভাবে নিবেন। 


আমি আজকে একদম নিউবর্ণ স্টেজ থেকে ১৮ মাস অব্দি ঘুমের ব্যাপারে কি রেকোমেন্ডেড তা নিয়ে আলোচনা করলাম না। যেহেতু আমাদের দেশ আর্থ-সামাজিক দিক থেকে অনেক পিছিয়ে এবং ভিন্ন তাই আমি আরো পরবর্তী স্টেজ নিয়েই লিখছি। 


দুই বছর বয়সী একটি শিশু হয়তো আমাদের বড়দের তুলনায় অনেক কিছুই বুঝেনা, তবে সে কিন্তু তার মতো করে অনেক কিছুই বুঝে। এই বয়সী শিশুরা এতো উৎসাহী হয় যে ওর চারপাশে যা দেখে তাই এক্সপ্লোর করে শেখার এবং চর্চা করার জন্য রীতিমতো অস্থির হয়ে থাকে। দেখবেন ২,৩,৪ বছর বয়সী শিশুরা টিয়াপাখির মতো যা শুনে তাই হুবুহু বলার চেষ্টা করে৷ কাজের ক্ষেত্রেও তাই, যা দেখে তাই কপি করে। তো এরকম শিশুদের এমনকি এর থেকেও বেশি বয়সী শিশুদের সাথে আমরা মা-বাবারা যখন একই বিছানায় ঘুমায় তখন কী কী হতে পারে? 


আমরা মা-বাবারা প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ এবং সম্পর্কে স্বামী-স্ত্রীও। সারাদিন শেষে আমরা যখন রাতে ঘুমাতে যাই আমাদের কতো রকম কথাই থাকে যা আমরা সারাদিনে একে-অন্যের সাথে বলার সুযোগ পাইনা। তাই আমরা যখন বাচ্চার পাশে শুয়ে কথা বলবো বাচ্চার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটতে পারে, এমনকি এমন কথাও সে শুনতে পারে যা তার শোনার কথা নয়। আবার দেখা যাবে বাচ্চার উঠে যাওয়ার ভয়ে আমরা কোন রকমে মুখ চেপে কথা বলছি। অথচ সারাদিন শেষে পার্টনারের সাথে এই সময়টুকু একান্তই আমাদের হওয়ার কথা ছিলো, সেখানে আমরা  মন খুলে কথা পর্যন্ত বলতে পারছিনা!  


আমরা যখন ঘুমাই তখন আমাদের সচেতনতা থাকেনা, দেখা যায় আমরা যে কেউ যখন তখন এপাশ উপাশ করছি, স্বপ্ন দেখে কথা বলে উঠছি, বিভিন্ন শব্দ করছি অজান্তেই, নাকও ডাকি অনেকে বিকট শব্দে।এবার দেখা গেলো এসব শব্দে বাচ্চা উঠে পরবর্তী দুই-তিন ঘন্টা আপনাকে আর ঘুমাতেই দিলোনা। একসাথে ঘুমালে এর সম্ভাবনা খুব বেশি থাকে। 


সবথেকে জরুরি ব্যাপার  হলো--অনেক মা-বাবারা ভাবেন বাচ্চা ঘুমিয়ে গেলে তো আর কোন সমস্যা নেই, ঘুমের বাচ্চা কি বুঝবে নাকি, জানবে নাকি। উনারা ওই একই বিছানায় অন্তরঙ্গ হোন যা কিনা একটি শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অনেক ঝুঁকিপূর্ন। এমনকি ওই সময়ে মা-বাবা নিজেও কিন্তু একটা অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যান না জানি বাচ্চাটি জেগে যায় কিনা। প্রায় প্রতিবারেই হয়তো এমনই চলতে থাকে। এতে করে দেখা যায় নিজেরদের দাম্পত্য সম্পর্ক বলে আর বিশেষ কিছু থাকেনা, দূরত্ব বাড়ে, ধীরে ধীরে সম্পর্কের অবনতি হতে থাকে, যার প্রভাব আমাদের সার্বিক জীবনে পড়ে।


বড়দের মতো শিশুদেরও ঘুমের সাইকেল আছে। ওদের ঘুম গভীর থেকে হালকা, হালকা থেকে গভীর স্তরে যায়। এখন প্রশ্ন হলো মা-বাবারা যখন তাদের একান্তই ব্যক্তিগত মুহূর্তে থাকেন তখন শিশুটি যে ঘুমের হালকা স্তরে নেই তা কিভাবে নিশ্চিত হতে পারি আমরা? আর শিশুটি যে কিছু দেখেনি বা শুনেনি তা-ই বা কিভাবে শিউর হতে পারি? শিশুরা ছোট থেকেই বিভিন্ন প্রেক্ষিতে কিছু বিষয় বুঝে যায় যে কিছুকিছু বিষয়ে প্রশ্ন করতে হয়না, বা কাউকে বলতে হয়না। তাই আপনাকে কিছু না বললে, বা চিৎকার করে না উঠলেই ধরে নেয়ার সুযোগ নেই সে এই বিষয়টি দেখেনি। 


সেক্সুয়াল বিষয়টি মানব জীবনের স্বাভাবিক একটি পার্ট। আমরা সব মানুষ এই পদ্ধতিতে পৃথিবীতে এসে থাকলেও, এতে এক্সপোজড বা পরিচিত হওয়ার একটি উপযুক্ত বয়স থাকে। কিন্তু সে বয়সটি কোনভাবেও ২,৩,৪…….১২ নয়। আর মা-বাবার অন্তরঙ্গ সময়কে দেখার মধ্য দিয়ে তো নয়ই। অনেক শিশুরা ভয়ে কুঁকড়ে যায় যখন তার মা-বাবার এই বিশেষ সময়ে তার ঘুম ভেঙে যায় কিন্তু সে মুখ ফুটে কিছু বলেনা হয়তো। বিভিন্ন এনজিওর গবেষনায় এসেছে থার্ড ওয়ার্ল্ডের অনেক শিশুরাই সর্বপ্রথম সেক্সুয়াল বিষয়ের সাথে পরিচিত হয় ঘর থেকে, তাও আবার নেতিবাচকভাবে। আরো পরিষ্কার করে বলতে গেলে মা-বাবার সাথে একই বিছানায় ঘুমাতে গিয়ে। ছোট একটি উদাহরণ দিলে আরো পরিষ্কার হয়ে যাবে বিষয়টিঃ আমাদের দেশে ছোট ছোট বাচ্চা ছেলে-মেয়েরা হাসব্যান্ড-ওয়াইফ খেলা করে এবং মা-বাবার মতো করে ফিজিক্যালও হয় অনেকে। বিভিন্ন সময়ের গবেষনায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। একটি সিনেমার একই দৃশ্য যদি দশজনকে দেখানো হয় তারা ভিন্নভিন্ন ভাবে নেবে, ঠিক তেমনি শিশুরা এইসব বিষয়কে কীভাবে নিবে তা আমরা কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারিনা, তবে এটা নিশ্চিত যে এটাকে তারা সুন্দরভাবে নেয়না। কারণ তাদের সে বয়সই হয়না এটাকে বুঝার, জানার। বরং তাদের মধ্যে অনেকে ভয় পায়, অনেকে আবার এটা প্র‍্যাকটিস করার জন্য অস্থিরও হয়ে যায়। 


কিছু কিছু পরিবারে আবার বাচ্চাদেরকে পরিবারের অন্য কোন সদস্যদের সাথে ঘুমাতে দেয়া হয়। যেমনঃ দাদা-দাদী, নানা-নানী, চাচা, খালা, মামা, ফুপু। আসলে কোন সম্পর্ক বা কোন ব্যক্তিকে অবিশ্বাস করতে বলছি না। তবে আপনাকে এটা মনে রাখতে হবে যে আপনার শিশু ছেলে বা মেয়ে যাই হোক না কেন সে আপনাদেরকে ছাড়া অন্য কারো কাছেই শতভাগ নিরাপদ নয়। তাই অন্য কারো সাথে আপনার সন্তানকে ঘুমাতে দিবেন না দয়া করে৷ আমাদের চারদিকে প্রতিনিয়ত এমন সব অপরাধ ঘটছে শিশুদের সাথে যা আমাদের রীতিমতো নাড়িয়ে দেয়ার মতো। শৈশবে যতো শিশু সেক্সুয়ালি এবিউজড হয় তার বেশিরভাগই পরিবারের সদস্য এবং কাছের আত্মীয়দের দ্বারা হয়ে থাকে। তাই আপনার শিশু কেবল এবং কেবলমাত্র আপনার কাছে নিরাপদ। 


**আলাদা রুম আমরা যদি নাই দিতে পারি শিশুকে তবে আলাদা বিছানা যেন অন্তত দেই। দুই বছরের পর শিশুর সাথে একই বিছানায় যেন আমরা না ঘুমাই। একই রুমে ঘুমালেও আলাদা বিছানা দিন। যদি ভালো ব্যবস্থা না করতে পারেন তবে খাটের উপরে-নিচে বিছানা করে হলেও শিশুকে আলাদা রাখুন। যদি তাও সম্ভব না হয় তাহলে অন্তত আপনাদের বিশেষ সময়ে আপনারা অন্য কোথাও যান, একই বিছানায় থাকবেন না।


আপনার শিশু এই সংবেদনশীল বিষয়টিতে যেন অন্তত আপনার মাধ্যমে, আপনার অসচেতনতার কারনে মিসগাইডেড না হয় সেই দায়িত্ব আপনার।


হ্যাপি প্যারেন্টিং।


#লেখাঃ শারমিন শামুন

#ছবিঃ সংগৃহীত 


0টি মন্তব্য:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এতে সদস্যতা মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন [Atom]

<< হোম